অভিশপ্ত বাড়ী(সত্য ঘটনা অবলম্বনে)
গল্পটা একটু আগাগোড়া বলা দরকার|সরকার ভিলার বসতি ছেড়ে তনুৱা নিখিল গঞ্জ রোডের ৩/১লেনে এক বাড়ী নিয়েছে|সে মস্ত একখানা বাড়ী|লোহার গেট খুলতেই দুইদিকে সারি দেওয়া ফুল গাছ, বাহারী ঝাউ গাছ.. দুইদিকে সেড দেওয়া বসার জায়গা, সামনে একটা বড়ো থাম, তাতে বিলেতি কায়দার রঙিন আলো|আর অন্দরে যাওয়ার ঠিক বাঁ পাশে একটা বিশাল শ্বেত পাথরের বুদ্ধ মূর্তি আর তার ঠিক সামনে নানান রঙের আলো দিয়ে সাজানো এক ঝর্ণা..|
একদেখাতেই এই বাড়ীটি সনাতন বাবুর মনে লেগে গিয়েছিলো|স্ত্রী বিভাদেবীর সঙ্গে পরামর্শ করে নিয়েই নিলেন এই বাড়ীটা|শহরের যানজট থেকে নিষ্কৃতি পাবার আশায় বেশ কিছুটা দূরে নিরিবিলি জায়গায় অসীম বাবু খুব সাধ করে এই বাড়ীটি তৈরী করেছিলেন, কিন্তু বেশি দিন এই বাড়ীটিতে থাকা তাঁর ভাগ্যে ছিল না|গুপ্ত শত্রুর হাতে তাঁর মৃত্যু হয়, পরে অসীম বাবুর ছেলে বিদেশে চাকরির সুবাদে ঘর বাড়ী বিক্রী করে চলে যান|তিন হাত ফেরত হয়ে শেষমেশ এই বাড়ীটি সনাতন বাবুর নজরে পরে|বাইরে থেকে কোনো কথাই যে তাঁর কানে আসে নি এমন না;আসলে তিনি সেসব কথায় আমল দেননি|এই বাড়ীটি ভুতুড়ে বাড়ী হিসাবেই সকলে চেনে, কিন্তু সনাতন বাবুর মতে'মানুষ থাকার জায়গা নেই, আবার ভূত!এসব ভূত টুত কিছুই হয় না... এসব মনের ভ্রম'|বরাবর কালের দাম্ভিক, বেরসিক টাইপ এর সনাতন বাবু ভাবেন,-ভাগ্যিস লোকে গুজব ছড়িয়েছিলো বাড়ীটি সম্মন্ধে;তাই তো তিনি জলের দরে বাড়ীটি কিনতে পেরেছিলেন!
সরকার ভিলা ছেড়ে মাস দুই হলো তারা নতুন বাড়িতে এসে উঠেছে|বিশাল বড়ো বাড়ী, সর্বসাকুল্যে ৭টি ঘর আর সদস্য মাত্র তিন জন|সনাতন বাবু, তাঁর স্ত্রী বিভাদেবী আর তাঁদের একমাত্র কন্যা তনু|সে এ বছর রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা নিয়ে পাশ করেছে|
সন্ধ্যেটা একটু অন্যরকম ভাবেই শুরু হয়েছিল আজকে|বর্ষার সন্ধে, অঝোরে জলের ধারা ঝোড়েই চলেছে|বসার ঘরে নিমন্ত্রিত বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে চায়ের আসরটি ভালোই জমে উঠেছিল|গল্প চলছিল সেকেলে কলকাতাকে নিয়ে|জানালার কাচ দিয়ে বাইরেটা ঝাপসা দেখাচ্ছে, সেই বিলিতি কায়দায় আঁটা থামের আলোটা থেকে যেন আলো বেরোতেই পারছে না|মনে হচ্ছে তার আপাদমস্তক কেউ একটা মলিন চাদর ফেলে দিয়েছে|পেয়ালার ঠকঠকানি আর হাসির শব্দ ছাড়া তনুর ঘর থেকে আর কিছুই শোনা যাচ্ছিলো না|বৃষ্টির ধারা জানালার কাচ বেয়ে পড়ছিলো, সেটাই সে বিভোর হয়ে দেখছিলো আর মাঝে মাঝে বজ্রের ঝলকানি একমুহূর্তে যেন অন্ধকার রাজ্যকে আলোর সমুদ্রে ক্ষনিকের জন্য কিভাবে চুবিয়ে দিচ্ছে সেটাই সে অন্তরে অন্তরে উপভোগ করছিলো|লোক মুখে নতুন বাড়ী সম্পর্কে ফিসফিসানি তারও যে কানে আসে নি তা না;বাবার মতোই সেও ভুতে বিশ্বাস রাখে না|তার মনে হয় ভূত হলো উষ্ণ মস্তিষ্কের অলীক কল্পনা ছাড়া আর কিছুই না... এসবই সে আনমনা হয়ে ভাবছিলো -হঠাৎ তার ঘাড়ে উত্তপ্ত নিশ্বাস পড়লো|একচমকে কিছু না দেখেই ঘাড় ফিরিয়ে বললো 'মা কখন এলে?'কিন্তু কোথায় তার মা, কেউ তো কোথাও নেই|অজানা ভয়ে তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত শিরশির করে উঠলো|সে বুঝতে পারলো না কি ঘটে গেলো!বাইরে অঝোরে বৃষ্টির ধারা পড়েই চললো আর মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি যেন পরিবেশ টাকে আরও গম্ভীর করে তুললো|
রাতের খাবার সনাতন বাবুরা একসঙ্গেই খেতে বসেছিলেন|বিভাদেবী লক্ষ্য করলেন আজ তনু পাতের খাবার নেড়েই চলেছে, যেন সে চিন্তিত|মেয়েকে জিজ্ঞাসা করেও কোনো সদুত্তর মিললো না|তনু নিজের মনেই মেলাতে চাইছিলো,-আজ সে কিসের স্পর্শ পেলো? যার কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না, যা বিশ্বাস করা যায় না, অথচ ঘটে গেলো!
পরদিন দুপুরবেলা টিউশন পড়ার জন্য তনু প্রস্তুত হচ্ছিলো|ব্যাগ গুছিয়েই সে বেড়িয়ে পড়লো|সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় সে বুঝতে পারলো, সে তো নামছে কিন্তু তার পিছন পিছন আরও কেউ নামছে|তার খসখসানি শব্দ সে অনুভব করতে পারছে|তার থামার সাথে সাথে ওই শব্দটাও থেমে যাচ্ছে|পিছন ফিরে তনু একবার চেয়ে দেখলো;না, কিছু তো নেই, কেউ নেই|মারাত্মক রকমের ভয় পেয়ে গেলো তনু|একছুটে এলোমেলো ভাবে নেমে সাইকেলটা নিয়েই বেড়িয়ে পড়লো|এসব তার সঙ্গে কি ঘটছে!টিউশন ক্লাসেও সে কিছুতে মনোযোগ দিতে পারলো না কেবল তার ঘটনাগুলো মনে হতে লাগলো আর ভয়ে যেন তার শরীর অবশ হয়ে যেতে লাগলো|সে ভাবলো মাকে সব ঘটনা জানানো দরকার|বিশ্বাস করুক, আর নাই করুক আজ সে বলবে কথাগুলো|জীবনে তার সঙ্গে যা কোনো দিন ঘটে নি, আজ কেন তার সঙ্গে এরকম অবাস্তব কিছু ঘটছে সেসব ভাবতে ভাবতেই সে বাড়ী ঢুকলো|
সন্ধ্যা নেমে গেছে|মেন গেট খুলেই সে একবার মূর্তিটার দিকে আর একবার বসার জায়গা গুলো দেখে নিলো|আজ যেন বাড়ীর মধ্যে ঢুকতে তার ভয় ভয় লাগছে|যেন মনে হচ্ছে অজানা, অচেনা কোনো প্রেতপুরিতে সে চলে এসেছে|সাইকেল টা রেখেই সে ভয়ে ভয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগলো|সে বুঝতে চাইলো কেউ তার পিছন পিছন উঠছে কিনা;কিন্তু না, কেউ তো এখন উঠলো না..... তবে কি এসবই তার মনের ভুল ছিল? সন্ধ্যেটা এসব ভাবতে ভাবতেই তার কেটে গেলো|মাকে তার কথাগুলো আর বলতে ইচ্ছা হলো না, সে ভাবতে লাগলো দেখা যাক আর কিছু ঘটে কি!
রাতের খাবার নিয়ে যে যার ঘরে শুয়ে পড়লো|পুকুর ভর্তি পানার দলকে যেমন তাড়িয়ে দিলে পুনরায় সে নিজের জায়গায় চলে আসে, তেমনি তনু হাজার চেষ্টা করেও মন থেকে সেই কথাগুলো সরাতেই পারলো না|এসব ভাবতে ভাবতেই কখন যে সে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল, হঠাৎ যেন তার দম বন্ধ হয়ে এলো.... গলায় হাত পড়তেই তার হাতে ঠেকলো তুলতুলে রোমশ দুটি হাত, সে নিশ্বাস নিতে পারছে না|তনুর গলা দিয়ে একটুও শব্দ বের হলো না, সে প্রাণপনে চেঁচাতে গেলো কিন্তু পারলো না... মনে মনে তারা মা শব্দটা উচ্চারণ করতে করতে যখন সে চোখ খুললো দেখলো সারা ঘরে বিদ্যুৎ খেলে গেলো আর কালো দুটি হাত খাটের দুপাশে সরে গেলো|খাটের মাঝখানে জড়োসড়ো হয়ে সে পড়ে রইলো|আলো জ্বালানোর ক্ষমতাটুকু পর্যন্ত তার আর নেই|মুখে সে বিড়বিড় করতে লাগলো আর অসহ্য ব্যাথায় গলায় হাত দিলো|তার সঙ্গে কি ঘটে গেলো তা সে বুঝতে পারলো না|
এই ঘটনার পর বহুবছর কেটে গেছে|তনু এখন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা|আর তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনার দুই দিন পরেই আকস্মিক ভাবে তার বাবা সনাতন বাবুর মৃত্যু হয়েছিল|তনুৱা ওই বাড়ী বিক্রী করে অন্যত্র চলে গিয়েছিলো|
হাজার ব্যাস্ততার মধ্যেও তনুর আজও মনে পড়ে সেই বাড়ীর অবিশ্বাস্য ঘটনাগুলি... কোনো কিছুতেই সে অঙ্কগুলি মেলাতে পারে না!...সেদিন কে তার পিছু পিছু নামছিলো? কে তার ঘাড়ে উত্তপ্ত নিশ্বাস ফেলেছিলো? কেই বা তার গলা চেপে ধরেছিলো? আর তার বাবা বসার ঘরে কি এমন দেখেছিলো যে তা দেখার পর তার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হয় নি, শুধু চোখ দুটো ভয়ে ঠিকরে বেড়িয়ে এসেছিলো?.... এই সব প্রশ্নের উত্তর তনু সারাজীবন ধরে খুঁজে বেড়াবে......|